Logo
| সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬

ব্যাংক বীমা

ফোর্সড লোনে বাড়ছে খেলাপি ঋণ, ব্যাংক খাতে বড় ঝুঁকির সতর্কবার্তা বিআইবিএমের

দেশের ব্যাংকিং খাতে উদ্বেগজনক হারে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ফোর্সড লোন’ (জোরপূর্বক ঋণ)-কে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানিভিত্তিক বাণিজ্য অর্থায়নে নন-ফান্ডেড দায় ফোর্সড লোনে রূপ নেওয়ায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান দ্রুত অবনতি হচ্ছে এবং ঋণঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বুধবার (৮ জুলাই) বিআইবিএম আয়োজিত ট্রেড সার্ভিস অপারেশন অব ব্যাংক’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেন বিআইবিএমের প্রফেসর (সিলেকশন গ্রেড) ড. শাহ মো. আহসান হাবীব। কর্মশালায় অংশ নেন দেশের জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার, নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা।

ট্রেড ফাইন্যান্সে বাড়ছে খেলাপি ঋণের চাপ

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ব্যাংকের ট্রেড ফাইন্যান্সে বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্য অর্থায়ন পোর্টফোলিওতে সম্পদের মানের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে। এসব ব্যাংকে ট্রেড ফাইন্যান্স-সংক্রান্ত খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ।

আর যেসব ব্যাংকে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের হার আগে থেকেই বেশি এবং একই সঙ্গে ট্রেড ফাইন্যান্সে বড় ধরনের এক্সপোজার রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে এ খাতের খেলাপি ঋণের হার ৮০ শতাংশেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

রপ্তানি অর্থায়নেও বাড়ছে ঝুঁকি

গবেষণায় বলা হয়েছে, বৈধ ও কার্যকর ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ছাড়া ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার প্রবণতা রপ্তানি অর্থায়নে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সময়মতো রপ্তানি আয় দেশে না এলে এসব অর্থায়ন দ্রুত ফোর্সড লোনে পরিণত হচ্ছে, যা পরে খেলাপি ঋণে রূপ নিচ্ছে।

বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচারের শঙ্কা

কর্মশালায় ড. শাহ মো. আহসান হাবীব বলেন, বর্তমানে ট্রেড-বেইজড মানি লন্ডারিং বা বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচারের অন্যতম বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখানো, একই চালানের বিপরীতে একাধিক বিল তৈরি, পণ্য পাঠানো ছাড়াই চালান দেখানো, ভুল তথ্য প্রদান এবং ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেনের মতো কৌশল ব্যবহার করে এ ধরনের অর্থপাচার করা হচ্ছে।

তিনি জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বিশ্লেষণে ৮৫৩টি সন্দেহজনক লেনদেনের মধ্যে ৬১০টিতেই বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের প্রমাণ মিলেছে। বিশেষ করে বস্ত্র, ধাতু, কৃষিপণ্য ও যানবাহন খাতে এ ধরনের অনিয়ম বেশি দেখা যায়।

কী সুপারিশ করেছে বিআইবিএম?

গবেষণায় ব্যাংক, কাস্টমস ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান আরও জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি লেনদেনের নথিপত্র যাচাই, গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিতকরণ (KYC) এবং বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি মূল্যায়ন আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কর্মশালায় বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও দ্রুত, নিরাপদ ও কাগজবিহীন করতে আধুনিক আইনগত ও ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বাণিজ্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো, নতুন আর্থিক পণ্য চালু এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।