রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল গিলে খাচ্ছে ঠিকাদার শাহ আলম!
এস এ কর্পোরেশন ও সিলভার জুবিলী লিমিটেডসহ নানা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহ আলম। যিনি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ‘অলিখিত রাজা’। গত ১৫ বছর আওয়ামীলীগ সরকারের একজন ডোনার ছিলেন তিনি, সেই দলের নেতাদের সখ্যতায় রেল অঙ্গনে করেছেন নানা অপকর্ম।
বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে যেকজন রেলমন্ত্রী ছিলেন তাদের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন শাহ আলম। যার সুবাদে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের লিজ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, স্ক্র্যাপ বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, সবই নিয়ন্ত্রণ করেছেন নিজ হাতে, এখনো সেই আধিপত্য ধরে রেখেছেন। রেলের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বাহিনীও। যে সরকার ক্ষমতায় আসুক ওই সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী-সচিব ও মহাপরিচালকে ম্যানেজ করেই রেলের আধিপত্য ধরে রাখেন তিনি। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে রেলের শত-শত একর জায়গা দখলের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
গত বছরের ৫ আগষ্ট ছাত্র-জনতার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও তীব্র প্রতিরোধের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শাহ আলম খোলস পাল্টিয়ে এখন বিএনপি-জামায়াতের লোক পরিচয় দিয়ে তার কুকর্ম দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে। যার নেতৃত্বে আছেন খোদ রেলওয়ের আওয়ামী মার্কা কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। যারা গত ১৫ বছর ধরে শাহ আলমকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে আসছেন।
রেলওয়ে সূত্র জানায়—এদিকে রেলওয়ের সরকারি নিয়ম ভেঙে একতরফা ফি জমা দিয়ে চট্টগ্রাম নতুন রেলওয়ে স্টেশনের কার পার্কিং দখল করে রেখেছে এস এ কর্পোরেশনের মালিক শাহ আলম। লিজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন টেন্ডার ঠেকাতে মামলা ও আদালতের স্টে অর্ডার এনে জায়গাটি দখলে রাখে প্রতিষ্ঠানটি। এতে কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
রেলওয়ে সূত্র আরও জানায়, শুধু চট্টগ্রাম স্টেশনের কারপার্কিং নয়, রাজনৈতিক প্রভাব ও অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে শাহ আলম হালিশহর এলাকায় অবস্থিত রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির (আরটিএ) জলাশয়, রেলের পরিত্যক্ত কোয়ার্টার, আইস ফ্যাক্টরি রোডের স্বপ্নীল গ্রামার স্কুলের জায়গা, আইস ফ্যাক্টরি রোড ব্যবসায়ী সমিতি লিঃ জায়গা, চুনারগুদাম ট্রাক মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের জায়গা, সাত রাস্তার মোড়ের তাসফিয়া গার্ডেনের জায়গা, শাহ আমানত রেলওয়ে সুপার মার্কেটের বিশাল জায়গা, পুরাতন স্টেশনে নূর-ই-হাবীব রেস্টুরেন্ট ও হেরিটেজ বি আর হোটেলের জায়গা, স্টেশন কলোনিতে ডিম কনসোর্টিয়াম প্রকল্পসহ অনেক জায়গা নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। এবং সব কটি জায়গা লিজের নামে দখল করে ফেলেছেন তিনি। মানছেন না উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞাও, আবার মানেন না রেলওয়ের নির্দেশনাও।
এদিকে শাহ আলমের বিরুদ্ধে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও কোন রূপ ব্যবস্থা নিচ্ছে না রেল কর্তৃপক্ষ ও দুদক। তাই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে আওয়ামী সরকারের আমলেও এই সরকারের আমলেও আধিপত্য কায়েম করে রেখেছেন শাহ আলম, আসলে তার খুটির জোর কোথায়? এমন প্রশ্ন জনমনে।
সম্প্রতি—বিএনপির নেতা ও সাবেক মন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের গুলশানের বাসায় শাহ আলমের তোলা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগে ছড়িয়ে পরলে তার রাজনৈতিক নয়া সমীকরণে পা দেয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। নুরুল ইসলাম সূজনের সঙ্গে পুরনো দিনের ছবি এবং সালাউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সদ্য তোলা ছবি দেখে ক্ষুব্দ রেলওয়ের ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদাররা।
ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা বলেন, আমরা যারা রাজপথে জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছি আওয়ামীলীগের ক্যাডারদের কারণে। সেই শাহ আলম ছিলেন আওয়ামী ডোনার, তিনি বর্তমানে হাইব্রীড দলের হয়ে কাজ করছেন, তিনি একজন স্বৈরাচারের দোসর, রেল থেকে বিভিন্ন সুবিধা নিচ্ছেন। রেলে আর কোনো ঠিকাদার কি নেই! তিনি রেলে এমনভাবে গেঁড়ে বসেছেন দুদকও অন্ধের ভূমিকায় রয়েছেন।
এদিকে রেলওয়ের স্ক্র্যাপ চুরি ও লুটপাটের ঘটনা নতুন কিছু নয়। নানা কায়দায় হচ্ছে স্ক্র্যাপ চুরি ও হরিলুট। এরমধ্যে টেন্ডারের আড়ালে স্ক্র্যাপ চুরি সহজ বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। সম্প্রতি এমন চুরি ও হরিলুট চলছে চোরের খনি হিসেবে চিহ্নিত সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে। আর এই স্ক্র্যাপের টেন্ডারও হাতিয়ে নিয়েছেন শাহ আলমের সমালোচিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশন।
এ বিষয়ে এই স্ক্র্যাপের টেন্ডার দাতা রেলওয়ে পাহাড়তলি ডিপোর সরঞ্জাম ক্রয় কর্মকর্তারা বলেন, রেল মানেই শাহ আলম, শাহ আলম মানেই রেল। পুরো রেলটাকে গিলে খাচ্ছে তিনি। যা প্রকাশ করলে আমাদের বিপদ আছে।
সূত্র জানায়, বিক্রিত মালামাল গত ২৭ নভেম্বর থেকে ডেলিভারি নেওয়া শুরু হয়। মোট ১২২টি ওয়াগনের মধ্যে সিজিপিওয়াই ও এসআরবিতে রয়েছে ১৬টি ওয়াগন। এসব ওয়াগনের কিছু মালামাল পুনঃব্যবহারযোগ্য পার্টস হিসেবে বিবেচিত, যেগুলো রিক্লেইমেবল পার্টস। যেমন-বগি ফ্রেম, চাকা ও এক্সেল বক্স, ব্রেক বিম, লাগেজ ডুফ, রকার বার, সুইং হ্যাঙ্গার, সোয়ান নেক, এক্সেল গার্ড ওয়েব, বগি, সেন্টার পিভট, ব্রেক শ্যাফ্ট, ভ্যাকুয়াম সিলিন্ডার, ট্রেন পাইপ, বাফার কাপলিংসহ ওয়াগন ও কোচের নিচের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।
তাছাড়া এই টেন্ডারের কার্যাদেশ পেতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ১০% কমিশন দিতে হয়। এই সুবিধা নেওয়ায় রেলের রি-ক্লেমএভল পার্টস বাপারিং লক মেইল/ফিমেইল, বাপারিং হুক, সেভেন প্লেট স্প্রিং এর মতো কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রাংশ নিয়ে যাচ্ছে স্ক্র্যাপের সাথে। যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেখেও দেখছে না।
জানা গেছে, টেন্ডারের মাধ্যমে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ব্যবহার অনুপযোগী ৭৬৫ টন স্ক্র্যাপ ক্রয়ের কার্যাদেশ পায় বিতর্কিত ঠিকাদার মো. শাহ আলমের মালিকানাধীন এস এ কর্পোরেশন। গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ওইসব মালামাল ডেলিভারি নেওয়ার জন্য জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক মো. আলমগীর কবির একটি চিঠি ইস্যু করেন। চিঠিতে বলা হয়, কার্যাদেশ ও সার্ভে শিট অনুযায়ী যেখানে যে অবস্থায় রয়েছে, সেখানে ওজন করে ‘এমটন’ হিসেবে ডেলিভারি নিশ্চিত করতে হবে।
সেল অর্ডারে বিক্রিত মালামালের ওজনে কম-বেশি হলে ফিডবুকে স্বাক্ষর ও লিপিবদ্ধ করতে হবে এবং ওজনের স্থিরচিত্র সংরক্ষণ করতে হবে। ওজনের সময় আরএনবি, টিএক্সআর, হিসাব শাখা ও ঠিকাদারের প্রতিনিধির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু এসব বিধি অনুসরণ না করে ওজন ছাড়াই মালামাল ডেলিভারি করা হয়েছে বলে একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে।
উপরোক্ত বিষয়গুলোর ব্যাপারে জানার জন্য এস এ কর্পোরেশনের মালিক শাহ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।
সূত্র—সকালের সময়