মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ‘সিসিএস’ বেলাল সরকারকে থামাবে কে!

রেলের পূর্বাঞ্চলে ইজিপি টেন্ডার নিয়ে কারসাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাঁচ দফায় সময় বৃদ্ধির পর ইজিপি টেন্ডার ওপেনিং করা ছিল সরঞ্জাম দপ্তরের রহস্যজনক ভূমিকা। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০২৫ লঙ্ঘন করে সুনির্দিষ্ট ঠিকাদারকে টেন্ডার পাইয়ে দিতে এ ধরনের কারসাজি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী কয়েকজন ঠিকাদার। এ নিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে চলছে আলোচনা সমালোচনা।

জানা যায়—রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক মোঃ বেলাল হোসেন সরকার স্বাক্ষরিত টেন্ডার নোটিশে এ ধরনের কারসাজির চিত্র উঠে এসেছে। উদ্দেশ্যমুলকভাবে টেন্ডারকে ঢেলে সাজাতে টেন্ডার সময় পরিবর্তন, শর্তারোপ, শর্ত শিথীল ও শর্তবৃদ্ধির মত আকস্মিক কারসাজি করা হয়েছে এই টেন্ডারে।

তিনি টেন্ডার প্রস্তুতকারীকে এ ধরনের কৌশলের নির্দেশনা দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় তিন কোটি টাকার টেন্ডারে এ ধরনের কৌশল খাটানোয় ব্যবসায়ীরার হতবাক। তবে ব্যবসায়ীদের ধারনা কোন একটি প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার পাইয়ে দিতে এ ধরনের নীলনক্সার প্রণয়ন করা হয়েছে কিনা তা প্রশ্নবিদ্ধ।

প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পিপিআর-২০২৫ নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে রেলের বিভিন্ন দফতর। এরমধ্যে গত বছরের ১৪ আগস্ট ই- টেন্ডার নং-১১২৯৪৪২, রেফারেন্স নং-৫৪.০১.১৫৪৩. ৩৩৫. ০৮.০০৬. ২০২৫ এ ড্রয়িং নম্বর-৪০-১৩০০-০২০-২৮৪ পার্ট-১০ অনুযায়ী ৫৬১টি শক এবজরবার ফর এক্সেল বক্স ক্রয়ের টেন্ডার নোটিস দেওয়া হয়েছিল ইজিপি পোর্টালে। সে অনুযায়ী টেন্ডার ওপেনিং এর নির্ধারিত দিন ধার্য ছিল গত বছরের ৩১ আগস্টে।

অভিযোগ উঠেছে—এতে সরবরাহকারীর ০৫ বছরের সাধারণ অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। সে সঙ্গে সুনির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা থাকতে হবে রেলওয়ে ক্যারেজ ও ওয়াগনে মালামাল সরবরাহের অভিজ্ঞতা। এ ছাড়াও একটি ঠিকাকার্য বা চুক্তির দলিল থাকতে হবে গত ১০ বছরের মধ্যে। এই চুক্তিমূল্য হতে হবে কমপক্ষে দুই কোটি ৭০ লাখ টাকার। এর সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে কোন সরকারী প্রতিষ্ঠানের রিসিপ্ট নোট বা গ্রহনযোগ্য সরবরাহ সনদ বা সরকারী দপ্তরের ক্রয় সনদ অথবা সন্তুষ্টি সরবরাহ সনদ অথবা সরকারী বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের সনদ দিতে হবে।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে—কোন ধরনের শর্তপরিবর্তন না করেই ৫ম ও ৬ষ্ঠ দফায় টেন্ডারকে পিছানো হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ৩১ আগষ্টের টেন্ডার দীর্ঘ পাঁচমাস পর গত বছরের ২৩ ডিসেম্বরে ওপেনিং করা হয়েছে। কেন বা কোন সরবরাহকারীকে সুবিধা পাইয়ে দিতে পাঁচ মাস পিছিয়ে টেন্ডার ওপেনিং করা হয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ।

প্রত্যক্ষ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১ম দফায় গত বছরের ৩১ আগস্ট টেন্ডার ওপেনিংয়ের কথা থাকলেও তা পিছিয়ে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর করা হয়েছিল। এতে সবচেয়ে উল্ল্যেখযোগ্য শর্ত- ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা মূল্যের টেন্ডার কন্ট্রাক্ট থাকতে হবে এমনকি তা গত পাঁচ বছরের মধ্যে হতে হবে।

২য় দফায়—টেন্ডার ওপেনিং সময় পরিবর্তন করে গত বছরের ০৩ নভেম্বর করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে উল্ল্যেখযোগ্য শর্ত ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা মূল্যের টেন্ডার কন্ট্রাক্ট থাকতে হবে এমনকি তা গত ১০ বছরের মধ্যে হতে হবে। এছাড়াও উক্ত পণ্য সরবরাহের ০৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

৩য় দফায়—টেন্ডার সময় পরিবর্তন করে নিয়ে যাওয়া হয় গত বছরের ১৭ নভেম্বর। এতে অন্যান্য শর্ত ঠিক রেখে সরবরাহযোগ্য পণ্য বা দ্রব্যটির ব্যবহারকারী কর্তৃক সেম্পল টেস্ট রিপোর্ট টেন্ডার সাবমিশনের সময় জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে এতে ইজিপি’র গোপনীয়তা নষ্ট হয়েছে এমনকি সেম্পল টেস্টকারীরা অনৈতিক সুবিধা নিয়েছে বিডারদের কাছ থেকে। এ ধরনের কোন শর্ত পিপিআর -২০২৫ এ ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

৪র্থ দফায়—টেন্ডার ওপেনিং সময় পরিবর্তন করে নিয়ে যাওয়া হয় গত বছরের ০৮ ডিসেম্বরে। এতে উল্ল্যেখযোগ্য শর্ত ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা মূল্যের টেন্ডার কন্ট্রাক্ট এর স্থলে তা পরিবর্তন করে এক কোটি ২০ লাখ টাকায় নিয়ে আসা হয়। তবে কেন এ ধরনের আকস্মিক পরিবর্তন করা হয়েছে বা কন্ট্রাক্ট শর্তকে অর্ধেকের নীচে নামিয়ে আনা হয়েছিল তা নিয়ে কৌতুহল ব্যবসায়ীদের মাঝে। টেন্ডার শর্ত পরিবর্তনের শর্তানুযায়ী অভিযোগ উঠেছে, যে প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার পাইয়ে দিতে উল্ল্যেখযোগ্য শর্ত ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা মূল্যের টেন্ডার কন্ট্রাক্ট থাকর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল ওই প্রতিষ্ঠানের এই শর্ত পূরণের ক্ষমতা ছিল না।

অবশেষে—৫ম দফায় টেন্ডার ওপেনিংয়ের সময় পরিবর্তন করে নিয়ে আসা হয় গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর। কিন্তু এতে আর কোন শর্ত পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কেন টেন্ডার পেছানো হল। নোটিশ স্বাক্ষরকারী প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক মোঃ বেলাল হোসেন সরকার কি কারণে টেন্ডার ওপেনিংয়ের সময় পিছিয়ে দিলেন তা আরো কৌতুহলী করে তুলেছে ব্যবসায়ীদের। প্রশ্ন উঠেছে, একটি টেন্ডার শুরু থেকে মেষ পর্যন্ত যদি ০৯ মাস সময় নেওয়া হয় তাহলে কি এ ধরনের পন্যের যথেষ্ট মওজুদ ছিল নাকি স্টক ও ভোক্তা বিভাগের এ ধরনের পন্যের কাটতি ছিল না।

এ ব্যাপারে গুরত্বপূর্ণ তথ্য জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক মোঃ বেলাল হোসেন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।

এ ব্যাপারে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের(সিপিটিইউ) এক পরিচালক বলেন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০২৫ অনুযায়ী, স্পেসিফিকেশন এন্ড টার্মস অব রেফারেন্স অনুযায়ী- ক্রয়কারী, পরামর্শকদের মধ্যে পক্ষপাতহীন ও উম্মুক্ত প্রতিযোগীতার পরিবেশ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে পরামর্শকদের কার্যপরিধি নির্ধারণের সময় পেশাগত ও সেবা ক্রয়ের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা প্রদান করতে হবে। তবে প্রতিযোগীতা সীমিত করতে পারে এইরূপ কোন শর্ত আরোপ না করার জন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০২৫ এ সুস্পষ্ট উল্ল্যেখ আছে।

বিডিরেল/এবিএম